আমি বিশ্বাস করি, দৃশ্যমাধ্যম শুধু একটি ভাষা নয়, এটি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো। শব্দ যুক্তি তৈরি করে, কিন্তু দৃশ্য জাগিয়ে তোলে আবেগ। ইতিহাসের প্রতিটি বড় সামাজিক আন্দোলনের দিকে তাকালেই দেখা যায়, সিদ্ধান্তের মুহূর্তে মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে একটি দৃশ্য—কোনো ভাষণ নয়, কোনো লেখা নয়। এই ভূখণ্ডে দৃশ্যমাধ্যমের ইতিহাস সে সত্যই বলে। থিয়েটারের মঞ্চ থেকে ক্যামেরার ফ্রেমে বাঙালির
জীবনকে ধরে রাখার যাত্রা শুরু হয়েছিল হীরালাল সেনের হাত ধরে। তখন দৃশ্য ছিল সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রকাশ। পাকিস্তান আমলে সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে ভাষার প্রতিরোধ। স্বাধীনতার পর সিনেমা হওয়ার কথা ছিল জাতীয় কণ্ঠস্বর। কিন্তু বাস্তবে আমাদের সিনেমা কোনো দিনই শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারেনি। হল কমেছে, দর্শক সরে গেছে, বড় পর্দা তার কেন্দ্রীয়তা হারিয়েছে। ফলে বহু বছর ধরেই আমরা শুনে আসছি, ‘সিনেমা মারা গেছে।’ প্রশ্ন হলো, সিনেমা কি সত্যিই মারা গেছে, নাকি সে শুধু জায়গা বদলেছে?
জুলাই আন্দোলন ও দৃশ্যের শক্তি
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন সেই প্রশ্নের উত্তর নতুন করে দিয়েছে। এই আন্দোলনের কোনো একক ইশতেহার ছিল না, কোনো কেন্দ্রীয় প্রচারদল ছিল না। ছিল কিছু ছবি, কিছু ভিডিও, মোবাইল ফোনে ধারণ করা কাঁপা ফ্রেম, লাইভ স্ট্রিম, রক্তমাখা শার্ট, ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণদের চোখ।
আন্দোলনে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে আবু সাঈদের ছবি। তাঁর রক্তাক্ত শরীরের দৃশ্য কোনো পরিকল্পিত প্রচারণা ছিল না, তবু তা একটি প্রজন্মের ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এই ছবিগুলো দেখে অসংখ্য তরুণ সিদ্ধান্ত নেয় রাস্তায় নামার, বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়ানোর। এখানেই দৃশ্যভাষার প্রকৃত শক্তি—এটি মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না, মানুষকে বদলে দেয়। রাষ্ট্রের ভাষা যেখানে ব্যর্থ হয়, দৃশ্য সেখানে কথা বলে। একটি স্থিরচিত্র কখনো কখনো হাজার শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। জুলাই আন্দোলন আমাদের সামনে আবারও দেখিয়েছে, ভিজ্যুয়াল ভাষা কিভাবে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
বড় পর্দা নয়, ব্যক্তিগত স্ক্রিন
আজকের দিনে সিনেমা আর শুধু প্রেক্ষাগৃহে বন্দি নেই। সিনেমা এখন ফেসবুকে, ইনস্টাগ্রাম রিলসে, টিকটকে। ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও অনেক সময় দুই ঘণ্টার চলচ্চিত্রের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলছে। কারণ এটি তাত্ক্ষণিক, ব্যক্তিগত এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মতো।
আজকের গল্প মুক্তির তারিখের অপেক্ষা করে না। গল্প পোস্ট হয়, শেয়ার হয়, ভাইরাল হয়। প্রথম তিন সেকেন্ডেই দর্শক সিদ্ধান্ত নেয় সে থাকবে, নাকি স্ক্রল করবে। ফলে দৃশ্যভাষা আরো তীক্ষ, আরো সংক্ষিপ্ত, আরো আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। এই নতুন বাস্তবতায় নির্মাতা মানেই শুধু শিল্পী নন, তিনি সচেতন বা অচেতনভাবে রাজনীতির অংশ।
স্ট্রিমিং, অর্থনীতি ও নতুন সিনেমা-বাস্তবতা
আজকের দিনে সিনেমা বোঝার সবচেয়ে বড় ভুল হলো, একে এখনো শুধু বড় পর্দার সঙ্গে আটকে রাখা। বাস্তবতা হলো, সিনেমা তার ঠিকানা বদলেছে। সে এখন ব্যক্তিগত স্ক্রিনে—মোবাইল ফোনে, ট্যাবলেটে, ল্যাপটপে, টেলিভিশনের স্মার্ট অ্যাপে। এই পরিবর্তন শুধু দর্শকের অভ্যাস বদলায়নি; এটি সিনেমার অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ক্ষমতার কাঠামোই আমূল বদলে দিয়েছে। স্ট্রিমিং দুনিয়ার সমকালীন আলোচনায় এখন একটি নাম ঘুরেফিরে আসছে—Adolescence । প্রায় সবাই দেখেছে, বা দেখবে। এই সিরিজের বিষয়বস্তু, চরিত্র বিশ্লেষণ, নৈতিক প্রশ্ন—এসব নিয়ে অচিরেই প্রচুর আলাপ হবে। তথাকথিত ‘পাকনা পাকনা’ সিনেমা সমালোচকরা টেবিল চাপড়াতে চাপড়াতে এর ডিসেকশন করবেন; ফ্রেম, থিম, সাবটেক্সট, রিপ্রেজেন্টেশন নিয়ে তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলবে। সেটি প্রয়োজনীয়ও বটে।
কিন্তু আমি একটু ভিন্ন হিসাব দিতে চাই—ইমোশন নয়, অর্থনীতির হিসাব।
এই সিরিজের নির্মাণ ব্যয় কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে ইন্ডাস্ট্রি সূত্র ধরে অনুমান করা হয়, Adolescence-এর প্রতিটি পর্বের খরচ ১৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। খুব সংযত হিসাব ধরলেও যদি আমরা প্রতিটি পর্বের খরচ ২০ মিলিয়ন ডলার ধরি, তাহলে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৪৪ কোটি টাকা প্রতি পর্বে।
এবার আসি দর্শকসংখ্যায়। অফিশিয়াল হিসাবে জানা যায়, সিরিজটি প্রথম চার দিনে দেখেছে প্রায় ২৪.৫ মিলিয়ন দর্শক। ধরুন, এদের সবাই নতুন সাবস্ক্রাইবার নয়, অনেকে পুরনো। তবু যদি আমরা খুব সাধারণ একটি অর্থনৈতিক অনুমান করি : নেটফ্লিক্সের গড় সাবস্ক্রিপশন ফি ধরা যাক মাসে ১৫ ডলার। তাহলে অঙ্কটা দাঁড়ায় এমন—
২৪.৫ মিলিয়ন x ১৫ ডলার = ৩৬৭.৫ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা, মাত্র এক মাসে, মাত্র একটি কনটেন্ট থেকে!
এখন এই সংখ্যার পাশে যদি আমরা আমাদের পরিচিত সিনেমা বাস্তবতাকে বসাই, তাহলে বিষয়টি প্রায় অবাস্তব মনে হয়। বাংলাদেশের একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র যেখানে ৫-১০ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে সংগ্রাম করে, সেখানে একটি স্ট্রিমিং সিরিজের একটি পর্বের বাজেটই ২০০ কোটির ওপরে। শুধু তা-ই নয়, এই বিনিয়োগ শুধু ‘ফিরে আসে’ না, এটি একটি কনটেন্টকে কেন্দ্র করে পুরো প্ল্যাটফর্মের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে। আর এখানেই আসল বিষয়টি পরিষ্কার হয়—নেটফ্লিক্স কোনো সিনেমা বানাচ্ছে না, তারা একটি ইকোসিস্টেম বানাচ্ছে। আজ নেটফ্লিক্সের মোট কনটেন্ট লাইব্রেরির আকার আনুমানিক আট হাজার ৫০০টিরও বেশি। এর মানে,
Adolescence একা কোনো দ্বীপ নয়; এটি একটি বিশাল কনটেন্ট মহাসাগরের অংশ। একজন দর্শক একটি সিরিজ দেখতে এসে আরেকটি দেখে, তারপর আরেকটি। সাবস্ক্রিপশন চলতেই থাকে। সিনেমা এখানে আর ইভেন্ট নয়; সিনেমা এখানে অভ্যাস।
এ কারণেই বড় পর্দা বনাম ছোট পর্দার বিতর্ক আজ অপ্রাসঙ্গিক। প্রশ্ন আর ‘কোথায় দেখা হচ্ছে’ নয়; প্রশ্ন হলো, কার হাতে নিয়ন্ত্রণ? হল মালিকের? প্রযোজকের? নাকি অ্যালগরিদমের?
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে সিনেমা এখন অ্যালগরিদমচালিত। কোন গল্প দেখা হবে, কোনটা চাপা পড়বে, তা অনেক সময় দর্শকের রুচির চেয়েও বেশি নির্ধারণ করে ডেটা। একই সঙ্গে এটি নির্মাতাদের এমন স্বাধীনতাও দিচ্ছে, যা বড় পর্দা কোনো দিন দিতে পারেনি। সেন্সর নেই, শো টাইমের চাপ নেই, প্রথম সপ্তাহের বক্স অফিস নেই। আছে শুধু দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। এই বাস্তবতা বুঝেই সম্ভবত ফরাসি নিউ ওয়েভের কিংবদন্তি নির্মাতা জ্যঁ-লুক গদার বলেছিলেন, I await the end of cinema with optimism.
এই উক্তি অনেকেই ভুল বোঝেন। এটি সিনেমার মৃত্যুর আনন্দ নয়; এটি সিনেমার রূপান্তরের আশাবাদ। গদার জানতেন, সিনেমা একটি নির্দিষ্ট যন্ত্র বা পর্দার নাম নয়; সিনেমা একটি ভাষা। আর ভাষা কখনো মরে না, সে রূপ বদলায়। আজকের ব্যক্তিগত স্ক্রিন সেই রূপান্তরের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ। সিনেমা এখন একা বসে দেখা হয়, কিন্তু একা অনুভূত হয় না। একটি সিরিজ দেখে মানুষ সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে লেখে, রিল বানায়, টিকটকে রিঅ্যাক্ট করে। দর্শক আর নীরব নয়; সে বয়ানের অংশ।
তাই আজ যখন আমরা বলি ‘বড় পর্দা নয়, ব্যক্তিগত স্ক্রিন’, তখন এটি কোনো নস্টালজিক আক্ষেপ নয়। এটি একটি বাস্তব স্বীকারোক্তি—ক্ষমতা স্থানান্তরিত হয়েছে। আর এই নতুন বাস্তবতায় সিনেমা আরো বেশি সমকালীন, আরো বেশি রাজনৈতিক, আরো বেশি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
সিনেমা শেষ হয়নি। সে শুধু নিজের জায়গা বদলেছে।
সিনেমা কি মৃত?
অনেকে বলেন, এই সবকিছু মিলিয়ে সিনেমার নান্দনিকতা নষ্ট হচ্ছে। আমি বলি, সিনেমার দায়িত্ব বদলাচ্ছে। আজকের দৃশ্য আর নিরপেক্ষ নয়। প্রতিটি ফ্রেম একটি অবস্থান। আপনি কী দেখাচ্ছেন, কী লুকাচ্ছেন—সবই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
হীরালাল সেনের সময় থেকে শুরু করে জুলাই আন্দোলনের মোবাইল ভিডিও পর্যন্ত্ত—এই দীর্ঘ যাত্রায় একটি বিষয় অপরিবর্তিত থেকেছে : মানুষ নিজের কথা বলতে চায়। মাধ্যম বদলায়, পর্দা ছোট হয়, ফ্রেম কাঁপে—কিন্তু বয়ান থেমে থাকে না। আজ সিনেমা আর শুধু হলে নেই। সিনেমা এখন রাজপথে, মানুষের হাতে, মানুষের ফোনে। আর যত দিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রয়োজন থাকবে, তত দিন দৃশ্যমাধ্যম শুধু শিল্প নয়; একটি জীবন্ত রাজনৈতিক ভাষা হিসেবেই বেঁচে থাকবে।
শেষকথা
এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো পরিবেশ তৈরি করা। একটি ভালো সিনেমা একা কিছু বদলায় না। একজন প্রতিভাবান নির্মাতাও একা টিকে থাকতে পারে না। দৃশ্যমাধ্যম বাঁচে ইকোসিস্টেমে। আর সেই ইকোসিস্টেম তৈরি করার সময় এখনই।



বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্সসহ উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এশিয়ায় চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, জাপান, কোরিয়া, হংকং শক্তিশালী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশও দ্রুত বিকাশমান স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে পরিণত হচ্ছে। বিকাশ ও নগদের সাফল্য দেশকে বৈশ্বিক মানচিত্রে পরিচিত করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করলেও সম্ভবনার নিরিখে অগ্রযাত্রা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।
দেশে স্টার্টআপ কার্যক্রমকে একটি খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর ইকোসিস্টেম। তরুণরা সমাজে বিদ্যমান মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তাদের ব্যাবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের প্রয়োজন হয় টেকনোলজির। আর এই টেকনোলজি হতে পারে নতুন বা পুরনো কোনো টেকনোলজির কিছুটা পরিবর্তিত রূপ। তা ছাড়া ব্যবসার উপকরণ, পদ্ধতি বা সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে উৎপাদিত পণ্য/সেবা মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমেও স্টার্টআপ হতে পারে। আমাদের দেশের উদোক্তারা বেশির ভাগ সময়ই বিশ্বে বিদ্যমান কোনো ব্যবসার অনুসরণে তার স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানটি দাঁড় করাতে চায়।
আমি এবার একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বপ্ন দেখি। আশা করি, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন একসঙ্গে কাজ করে জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন উপহার দিতে পারবে। এই নির্বাচনে যেন আমি এবং আমরা সবাই উৎসাহ নিয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আমাদের ভোট দিতে পারি।
স্বৈরাচার পতনের পর তাদের মধ্যেই এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সচেতনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে আগামী সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে জেন-জির মধ্যে বিপুল আগ্রহ-উদ্দীপনা ও প্রত্যাশা রয়েছে। জেন-জি প্রজন্মের একজন হিসেবে আমিও আমার চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরতে চাই।